শরমিলি সারমিন লাভলী : | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
মমতা বুয়া ঘর ঝাড়ু দিতে এসে মেম সাহেব নীলাকে বললো,
—খালা , আমি আপনাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিছি এক্সেপ্ট কইরেন।
নীলা হেসে বললো,
-আচ্ছা, আজকে দেখে এক্সেপ্ট করবো।
দুপুরে খাবার পর চা হাতে সোফায় হেলান দিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই নোটিফিকেশন চোখে পড়ল নীলার … Momota Begum send you a friend request. Confirm বাটনে চাপ দিয়ে মমতার প্রোফাইলে ঢুকেই চোখ আটকে গেল সরষে ক্ষেতে তোলা ছবি গুলোতে।গতকালই মমতা ওর স্বামীর সাথে বেশ কিছু ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছে । সরষে ক্ষেতে তোলা মমতা ও তার স্বামীর রং বেরঙের ছবিগুলো দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো নীলার। গত তিন বছর যাবৎ সরষে ক্ষেতের ভেতর ছবি তোলার ইচ্ছে থাকা সত্বেও বিভিন্ন কারণে যাওয়া হয়ে উঠেনি।এবছরও আসাদ সময় করে উঠতে পারেনি। অবশ্য নীলাকে বলেছিল ,
—তুমি বান্ধবীদের নিয়ে যাও, আমি অফিসে ব্যস্ত।
কিন্তু নীলার আসাদকে ছাড়া যেতে ইচ্ছে করেনি। আসাদকে ছাড়া যেন কোনো সুখই পূর্ণতা পায় না নীলার, অথচ আসাদ ব্যস্ত থাকে নিজের দুনিয়ায়।ফেসবুকে মমতার হাসিখুশি,সহজ সরল আনন্দভরা ছবিগুলো দেখে আসাদকে দোষারোপ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। নিজের অজান্তেই নীলা ভাবলো, আমার জীবনে এমন আনন্দময় সুখ কবে আসবে? নীলা আসলে খুবই সুখী ছিল সকালটা জুড়ে।কিন্তু ফেসবুক খুলতেই হঠাৎ সেই সুখটুকু কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
বেশ কিছুদিন ডেঙ্গু জ্বর থাকার কারণে নীলা কিছুটা বিষন্নতায় ভুগতো। আর এ কারণে গত সপ্তাহেই আসাদ নীলাকে নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলো, তার বিষণ্নতা কমাতে। কক্সবাজারের কাপল ছবিগুলো ফেসবুকে পোস্ট করতেই এক ঘন্টার মধ্যে কমেন্টের ঝড় বয়ে গেল। কেউ লিখলেন Nice couple, কেউ লিখলেন Happy couple, Evergreen love কেউ লিখলেন রাজ্জাক কবরী।
নীলার বান্ধবী সুরভী নীলার ছবিগুলো দেখে কমেন্ট করলো,
ওয়াও খুব সুন্দর লাগছে দুজনকেই!
মনে মনে ভাবলেন,আসাদ ভাই কত রোমান্টিক! নীলাকে নিয়ে কি সুন্দর সুন্দর কাপল ছবি তুলেছেন ! অথচ আরিফ কে ক্যামেরার সামনে নেওয়াই যায় না। তাছাড়া ও আমাকে সহজে কোথাও নিয়ে ঘুরতেও যেতে চায় না। সব সময় আমাকেই বলতে হয় ওকে। দুপুরের লাঞ্চ শেষে সুরভী গভীর নিশ্বাস ফেলে স্বামী আরিফকে বললো,
-এই দেখো, নীলার স্বামী কত রোমান্টিক! নীলাকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরে এসেছে। আর কত সুন্দর কাপল ছবি তুলেছে। আর তুমি? আমার সাথে ছবি তুলতেই চাও না। আর তুললেও মুখ ভার করে থাকো।আমাদের সাজেকে তোলা সব কাপল ছবিগুলো তোমার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। একটাও ঠিকঠাক কাপল ছবি পাইনি !আমার সাজেক বেড়ানোটাই তুমি মাটি করে ফেলেছিলে।
আরিফ নীরব, ফোনে খবর পড়ছিল। কিছু না বলে কফিতে চুমুক দিল। কিন্তু তার ভেতরে ক্ষোভ জমে গেল, যেন তাকে তুলনা করে ছোট করা হলো।সেই রাতেই তুচ্ছ কারনে দুইজনের মধ্যে ছোট্ট ঝগড়া হলো। সুরভী রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারলো না। তাহলে কি সত্যিই আমার জীবনটা এত নির্জীব হয়ে গেছে? মনটা কেমন একটা অদ্ভুত হাহাকারে ভরে উঠল।
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আরিফের কলিগ মাসুদের চোখে পড়লো সুরভী আর আরিফের সাজেক ভ্রমণের ছবি। প্রাণবন্ত কাপল ছবিগুলো দেখে মাসুদের মুখ ভারী হয়ে উঠলো।তারমধ্যে সুরুভী ছবির ক্যাপশন দিয়েছে ….
—দু’জন দু’জনার কত যে আপন তা কেউ জানে না…
সুরভী ভাবি শ্যামলা হলেও কত সুন্দর স্মার্ট। কি দারুন লাগছে তাকে ! যত বয়স হচ্ছে এই মহিলা যেন ততো সুন্দরী এবং আকর্ষণীয় হচ্ছে ।অথচ আমার স্ত্রী রুমু ফর্সা হলেও আজকাল তাকে দেখতে ফ্যাকাশে লাগে। তারমধ্যে বাবু হওয়ার পর ও বেশ মুটিয়ে গেছে। মুখে আগের মতো উজ্জ্বলতা নেই। অফিস থেকে বাসায় ফিরলে সবসময় রুমুর ক্লান্ত চেহারা দেখতে হয়। মাসুদ অনেকবার রুমুকে বলেছে ডায়েট কন্ট্রোল করে স্লিম হতে কিন্তু মাসুদের কথার কোন পাত্তাই দেয় না রুমু। এই নিয়ে মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে মন কষাকষি হয়। আজকে মাসুদের মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল। ফেসবুকের একটি পোস্ট, কয়েকটি ছবিই যেন দু’জন মানুষের সম্পর্কের মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল।
মাসুদ তার স্ত্রী রুমু এবং বেবীকে নিয়ে একটি নতুন প্রাইভেট কারের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি দিয়েছে আর ক্যাপশন লিখেছে— My new car। ট্যাগ করেছেন রুমুর ছোটবোন ঝুমুকে। ঝুমুর মিউচুয়াল ফ্রেন্ড আনিকা ছবিটা দেখে চমকে উঠেন! এ তো সেই মাসুদ …যার সঙ্গে আনিকার বিয়ের কথা হয়েছিল একসময়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আনিকাই মাসুদকে রিজেক্ট করেছিল শুধু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। তখন মনে হয়েছিল, টাকার অভাব মানেই অপ্রতুল জীবন। কিন্তু আজকের ছবিটা দেখে আনিকা মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, আমি কি ভুল করেছিলাম সেদিন মাসুদকে ফিরিয়ে দিয়ে? আজ মাসুদ গাড়িও কিনেছে, সুখী পরিবারও পেয়েছে। অথচ বিয়ের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘মা’ হতে পারিনি আমি। ফেসবুকের পর্দায় মাসুদের হাসিমুখে পারিবারিক ছবি দেখে তার নিজের জীবনের নিঃশব্দ হাহাকার যেন আরও প্রকট হয়ে উঠলো। তার স্বামী শফিক এখন আর্থিক সমস্যায়। সেই কবে একটা প্রাইভেট কার কিনেছিল সেটা এখন একদম ওল্ড হয়ে গেছে ।শফিককে বললেও সে এখন নতুন প্রাইভেটকার কিনবে না সেটা আনিকা জানে। তবুও শফিক বাসায় ফেরার পর মাসুদের পারিবারিক ছবিটা দেখিয়ে বললো,তোমাকে মাসুদের কথা বলেছিলাম না ..ওই যে আমি যার বিয়ের প্রোপেজাল রিজেক্ট করেছিলাম । দেখেছো মাসুদের নতুন গাড়ি? লোকটা তো একদম চেঞ্জ হয়ে গেছে! বাচ্চাটাও কি সুইট হয়েছে।
শফিক কিছু না বলে চুপ করে রইলো। কিন্তু সেই নীরবতা রাতের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াইয়ে পরিণত হলো।
শফিকের ড্রাইভার বারেক মিয়া নিজের প্রোফাইলে গত বছরের তোলা একটা পারিবারিক ছবি শেয়ার দেন .. যে ছবি কভার ফটো ছিল। ছবিটা দেখে অচেনা হাহাকার তার বুক ছুঁয়ে গেল। শফিক ভাবে… বারেকরা সাত ভাই বোন কত মিল ।বাবা মায়ের সাথে সাত ভাই বোনের হাস্যোজ্জ্বল মায়াময় পারিবারিক ছবি ।কি শক্ত পারিবারিক বাঁধন! অথচ আমাদের তিন ভাইবোনের ই মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
অন্যদিকে নিজের শেয়ার দেওয়া গতবছরের পারিবারিক ছবিটা দেখে বারেক মিয়ার কখন যে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে নিজেই টের পায়নি । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবছে …বাবার অসুস্থ্যতার কারণে তবু আমরা সাত ভাই বোন এক হয়ে ছবিটা তুলেছিলাম । অথচ বাবার মৃত্যুর এক বছর যেতে না যেতেই সাত ডিসিমল বাড়িটা নিয়ে সাত ভাই বোনদের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়ে গেছে… ঝগড়া লেগেই থাকে। অভিমান আর সম্পর্ক ভাঙ্গনের কারণে আগের মতো সুসম্পর্ক নেই কারো সাথেই। বারেক মিয়া চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছতে মুছতে ভাবলো …বাবা ছিলেন বলেই আমরা সবাই একসাথে ছিলাম।বাবার মুখটা যেন আশীর্বাদের মতো তাকিয়ে আছে সবার দিকে। সময় বদলে গেছে, সম্পর্কগুলোও দূরে সরে গেছে।তবুও এই ছবিটাই মনে করিয়ে দেয় — আমরা একসময় সবাই একত্রে ছিলাম। ছবিটা এখন শুধুই স্মৃতি।
ফেসবুক আজ যেন এক রঙিন মুখোশ।ফেসবুকে সবাই সুখী, শুধু বাস্তবেই সুখের অভাব।নীলা, সুরভী, মাসুদ,আনিকা,বারেক — সবাই নিজের মতো করে সুখের ছবি পোস্ট করে। কিন্তু সবার ভেতরেই জমে আছে অপূর্ণতা, তুলনা, ঈর্ষা,অনুতাপ । এ যেন এক নতুন অসুখ।
Posted ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh